এম এস ভূঁইয়া:
একটি সিভি। সেখানে বয়স মাত্র আঠারো। সদ্য এসএসসি পাস করা একটি মেয়ে চাকরি খুঁজছে। এই একটি তথ্যই তার পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য যথেষ্ট। কারণ এই বয়সে কেউ চাকরির বাজারে নামে না, যদি না সংসারের প্রয়োজন তাকে বই-খাতা ছেড়ে জীবিকার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করে।
তার কাছে একটি চাকরি মানে শুধু মাস শেষে একটি বেতন নয়। সেটি হয়তো অসুস্থ মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের স্কুলের বেতন, কিংবা বর্ষায় চুইয়ে পড়া টিনের চাল মেরামতের স্বপ্ন।
কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র কি সেই স্বপ্নকে মর্যাদা দেয়?
বাস্তবতা হলো, এই দেশে বহু মানুষ এখনো বিশ্বাস করেন—যোগ্যতা, পরীক্ষা কিংবা মেধার পাশাপাশি একটি "সুপারিশ" না থাকলে চাকরি পাওয়া কঠিন। আর সেই সুপারিশের জন্য দরজায় কড়া নাড়তে হয় কোনো রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে। এ যেন একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি—যেখানে নাগরিকের অধিকারকে অনুগ্রহে পরিণত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় আলোচনায় এসেছে এমনই এক তরুণীর সিভি এবং একজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এমন অভিযোগকে গুরুত্বহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কারণ প্রশ্নটি কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিয়ে।
যখন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তখন সেটি ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে জনস্বার্থের বিষয়। তখন নীরবতা নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্মান ফিরে পাবেন। আর অভিযোগ সত্য হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। গণতন্ত্রে এটাই স্বাভাবিক পথ।
কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন অন্যত্র।
কেন একজন দরিদ্র মেয়েকে চাকরির জন্য কোনো এমপি, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার দরজায় যেতে হবে? কেন একটি সিভির মূল্য নির্ধারণ করবে কোনো ক্ষমতাবান মানুষের কলমের একটি দাগ?
যেখানে নিয়োগব্যবস্থা স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক, সেখানে সুপারিশের সংস্কৃতির কোনো স্থান থাকার কথা নয়। অথচ আমাদের বাস্তবতায় এই সংস্কৃতি টিকে আছে বছরের পর বছর। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক দল বদলেছে, কিন্তু সুপারিশনির্ভর সংস্কৃতি বদলায়নি।
প্রতিটি নির্বাচনের আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে "জিরো টলারেন্স"-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই একই সুপারিশের সংস্কৃতি বহাল থাকে। কারণ সুপারিশ কেবল একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি ক্ষমতার একটি কার্যকর হাতিয়ার। এটি সাধারণ মানুষকে নির্ভরশীল করে রাখে এবং নাগরিকের অধিকারকে ব্যক্তিগত অনুগ্রহে পরিণত করে।
এই নির্ভরশীলতার মধ্যেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। কারণ একজন অসহায় নাগরিক যখন মনে করেন, তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। আর যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না, সেখানে অপব্যবহারের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
সুতরাং আজকের বিতর্ক কেবল একটি অভিযোগের নিষ্পত্তি নয়। এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—চাকরি কি নাগরিকের অধিকার, নাকি ক্ষমতাবানদের দয়ার দান?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি তদন্ত প্রতিবেদনে মিলবে না। এর উত্তর মিলবে তখনই, যখন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে যেখানে কোনো দরিদ্র তরুণীকে একটি চাকরির আশায় কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির ব্যক্তিগত দরজায় দাঁড়াতে হবে না। কারণ যে রাষ্ট্রে অধিকার পেতে সুপারিশ লাগে, সেখানে শুধু দুর্নীতিই জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় ভয়, নির্ভরতা এবং শোষণের এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি ।
লেখক: মিডিয়া কর্মী
দৈনিক নেইবার
