১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মতো নারী সদস্য নিয়োগের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নারীরা নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।একসময় সহায়ক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকা নারী পুলিশ সদস্যরা এখন বাহিনীর প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। কমিউনিটিতে টহলরত কনস্টেবল থেকে শুরু করে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা পর্যন্ত সব পর্যায়েই তাদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার মাধ্যমে নারী পুলিশ সদস্যরা কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালন করছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি অগ্রগতি। কর্মদক্ষতার দিক থেকে তারা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।’
শিল্প পুলিশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে অধিকাংশ শ্রমিক নারী হওয়ায় শ্রম অসন্তোষ নিরসনে নারী পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নারী পুলিশ সদস্যদের অবদান ছাড়া শিল্পাঞ্চলে শ্রম অসন্তোষ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হতো।
শিল্প পুলিশ ইউনিট-৩, চট্টগ্রামে কর্মরত পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম ১৬ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বাহিনীর নারী সদস্যদের আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠা তাকে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি বলেন, পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে নারী কর্মকর্তারা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের মতো উচ্চ পদে পৌঁছেছেন, যা আরও বেশি নারীকে পুলিশে যোগদানে উৎসাহিত করছে।
অপরাধ বিভাগে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মাহমুদা বলেন, ধর্ষণ বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীরা আমাদের কাছে এলে অনেক বেশি খোলামেলা কথা বলেন, কারণ তারা মনে করেন আমরা তাদের অনুভূতি বুঝতে পারি।
তিনি বলেন, অনেক নারী ও শিশু ভুক্তভোগী পুরুষ কর্মকর্তাদের সামনে তাদের ট্রমার অভিজ্ঞতা বলতে সংকোচ বোধ করেন। নারী তদন্তকারী হিসেবে দ্রুত আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়, যা তদন্তে প্রমাণ সংগ্রহের মান উন্নত করতে সহায়তা করে।
পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বলেন, আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তার ভাষায়, ‘জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তারা যখন নবীন সহকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেন, তখন তা পুরো বাহিনীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এখন বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেওয়া তরুণীরা জানেন, নিষ্ঠা ও পেশাগত উৎকর্ষের মাধ্যমে নেতৃত্বের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।’
শিল্প পুলিশে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহমুদা বলেন, নারী পোশাকশ্রমিকরা নারী কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং তিনি সবসময় তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন।
তিনি জরুরি পরিস্থিতিতে বা পুলিশি সহায়তার প্রয়োজন হলে নারী শ্রমিকদের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করার পরামর্শ দেন।
যদিও নারী সদস্যদের সংখ্যা ও দায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তবুও নেতৃত্ব, তদন্ত ও অপারেশনাল পুলিশিংয়ে সমান প্রতিনিধিত্ব অর্জনের পথ এখনও অনেক বাকি বলে মনে করেন নারী কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি রাজারবাগ বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের (বিপিডব্লিউএন) ২০২৪-২০২৭ কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক ঢাকা বিভাগীয় পরামর্শ কর্মশালায় এ বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।
বাংলাদেশ পুলিশে ১৯৭৪ সালে প্রথম নারী সদস্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। সে সময় তাদের দায়িত্ব মূলত প্রশাসনিক ও সীমিত পরিসরের ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক নানা বাধা অতিক্রম করে আজ কনস্টেবল, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), উপপরিদর্শক (এসআই), পরিদর্শক, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার (এসপি), উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), অতিরিক্ত ডিআইজি এবং অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার বিভিন্ন দায়িত্বে কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাহিনীতে ১৭ হাজার ৯৭০ জন নারী সদস্য কর্মরত রয়েছেন, যা মোট জনবলের ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ।
নারী সদস্যরা বর্তমানে মহানগর পুলিশ, জেলা পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সর্বনারী ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসা অর্জন করেছে।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন) নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত উন্নয়নের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
সংগঠনটির পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হলো— সব পর্যায়ে নারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদে উন্নীত করা, পেশাগত ও তদন্ত দক্ষতা বাড়ানো, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং জোরদার করা।
কর্মশালায় বিপিডব্লিউএনের সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশিক্ষণ-২) মোছা. শাহালা পারভীন নারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে ২০২৪-২০২৭ কৌশলগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
কর্মশালায় সাইবার অপরাধ তদন্ত, সাইবার সচেতনতা, মানসিক সুস্থতা, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্পর্কেও বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিরা ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশিং বিষয়ে কারিগরি অধিবেশন পরিচালনা করেন এবং তদন্তে জেন্ডার-সংবেদনশীল পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিপিডব্লিউএন ও ইউএন উইমেনের প্রশিক্ষণে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক তদন্ত, ট্রমা-সচেতন সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং নারী ও শিশুদের জন্য সমন্বিত সহায়তা সেবার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মহানগর পুলিশ ইউনিটে কর্মরত একজন নারী উপপরিদর্শক বলেন, নারী কর্মকর্তারা বড় ধরনের অপারেশন পরিচালনায়ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব বেড়েছে। তবে গোয়েন্দা কার্যক্রম, অপরাধ তদন্ত ও অপারেশনাল নেতৃত্বের সুযোগও একইভাবে বাড়ানো উচিত। নারী কর্মকর্তারা বারবার প্রমাণ করেছেন যে আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে জটিল অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম।
ঢাকা বিভাগীয় কর্মশালায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের পক্ষে এনরিকো লরেনজোন বলেন, বিপিডব্লিউএনের কৌশলগত পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের ওপর।
এদিকে ইউএন উইমেনের এন্ডিং ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন ইউনিট-এর ব্যবস্থাপক শ্রাবণা দত্ত নারী কর্মকর্তাদের পেশাগত সক্ষমতার ঘাটতি চিহ্নিত করার আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়ন কার্যক্রমে নারীদের ক্রমেই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আনা হচ্ছে। সাইবার অপরাধ তদন্ত জোরদার করা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশিং সম্প্রসারণ এবং নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে বাহিনী ধীরে ধীরে তার কার্যক্রমে নতুন রূপ দিচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্যের মাত্র ৯ শতাংশের কিছু বেশি নারী হলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের ধারা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ নেতৃত্ব, উন্নয়ন সহযোগী এবং নারী কর্মকর্তারা মনে করেন, নিয়োগ বৃদ্ধি, নেতৃত্বের সুযোগ সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং অপারেশনাল দায়িত্ব বাড়ানো হলে কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নারীরা আরও কার্যকর অবদান রাখতে পারবেন।
বিপিডব্লিউএনের ২০২৪-২০২৭ কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী পুলিশ সদস্যরা আশা করছেন, তাদের অগ্রযাত্রার আগামী অধ্যায় শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং সমান সুযোগ, আরও শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং জনগণের বৈচিত্র্য প্রতিফলিত করে এমন একটি আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে চিহ্নিত হবে।
