তিনি বলেন, ‘গতকাল একটা মিটিং হয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রী, অনেক বড় প্রশ্ন…। একটা দেশের প্রশাসনিক প্রধান ব্যক্তি, উনি আমাদের মিটিংয়ে কী বলেছেন জানেন? খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন— মন্ত্রী মহোদয়গণ, আমি একটা কথা বলবো আজকে, বিনয় করে বলা, আপনারা রাখতেও পারেন আমার কথাটা, নাও রাখতে পারেন।’স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কিন্তু হুবহু কোট করছি—রাখতেও পারেন আমার কথাটা নাও রাখতে পারেন। তবে আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখেছি, আপনাদের আমার বলা উচিত, এখন আপনাদের ইচ্ছা! যেটা বলব, আমি এটা করছি। আমার আব্বা (সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) প্রতিমাসে তার বেতন থেকে ১০ শতাংশ বেতন সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতেন গরিব-মিসকিন মানুষদের সহযোগিতা করার জন্য বা সরকারি কোনও প্রয়োজনে খরচ করার জন্য। আমি কিন্তু বেতন নিচ্ছি, না নিয়ে চলতে পারতেছি না। আমার বেসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, ১০ শতাংশ হারে আমি ১১ হাজার ৫০০ টাকা প্রতি মাসে বেতন থেকে জমা দিচ্ছি। বেতন যখন একাউন্টে আসে আমি তুলে একটা চেক দিয়ে দেই গভর্নমেন্টের অ্যাকাউন্টে। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আমার আব্বা কাজটা করতেন, আমি করছি; আপনারাও যদি মনে কিছু না নেন বা যদি আপনাদের পক্ষে সম্ভব হয় আপনারাও প্রতি মাসে ১০ শতাংশ আপনাদের বেতনের টাকাটা সরকারের ঘরে ফেরত দিয়ে দেবেন।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলেছি। খুশি হয়েছি যে উনি আমাদের কাছে অ্যাপ্রোচটা করেছেন।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের একটি শ্রেণী অতিমাত্রায় মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। মানুষের কল্যাণ বা দেশের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, একসময় দেশে অধিকাংশ সন্তান জন্ম হতো স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ দাইয়ের সহায়তায় নিরাপদে সন্তান প্রসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। এখন স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটলেও স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতা বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রীর দাবি, গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখায়। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’—এমন আশঙ্কা তৈরি করে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্তে বাধ্য করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই মা ও সন্তানের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় পরিবারগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নেয়।
তিনি বলেন, চিকিৎসকরা মানুষের কাছে আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতার বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টির বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুর জীবনের শুরু থেকেই যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে এবং মায়েদের দুর্বল স্বাস্থ্য শিশুদের নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিডওয়াইফদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় দক্ষ মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; বরং জাতির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়।
তিনি আরও জানান, চলতি বছর স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের বড় অংশই মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।
একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী শনিবারের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। কোনো ক্লিনিক এ নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সভায় জানানো হয়, ৪০টা নরমাল ডেলিভারি পরে একজন ধাত্রী রেজিষ্ট্রেশন পান। প্রতি বছর মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ৫৮০০ ধাত্রী দক্ষ হয়ে উঠেন। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে তাদের কাজের সুযোগ না থাকায় এ সকল ধাত্রীদের সিংহভাগই ঝরে পড়েন। এর মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে বছরে শুধুমাত্র
৫০০ ধাত্রী কাজ করার সুযোগ পেলেও বাকীরা সাধারণ নার্স হিসাবে কাজ করেন। এতে শিশু জন্মের সময় দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুন, বিএমএসের সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতার ও বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতার প্রমুখ।
