ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফল বিপর্যয়: আমাদের আত্মউপলব্ধির সময়-- শেখ শাহজাহান সাজু:

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 12, 2026 ইং
এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফল বিপর্যয়: আমাদের আত্মউপলব্ধির সময়--  শেখ শাহজাহান সাজু: ছবির ক্যাপশন: সিজিয়ারা উচ্চ বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশে
এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষিত ও সচেতন মহলে হতাশা দেখা দিয়েছে। একসময় যেখানে শতভাগ পাসের সাফল্য ছিল অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক চিত্র, সেখানে এবার কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। নাঙ্গলকোট উপজেলার চিত্র আরও উদ্বেগজনক—এখানে পাসের হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
এই ফলাফল নিঃসন্দেহে আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। কেন এই ফল বিপর্যয়? এর দায় কি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিচালনা কমিটি কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার? একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর জন্য কোনো একক ব্যক্তি বা পক্ষকে দায়ী করা যায় না। বরং আমরা সবাই কমবেশি এর জন্য দায়ী। তবে হতাশ না হয়ে এই ফলাফলকে আত্মসমালোচনা ও আত্মউপলব্ধির সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত।
ফরম পূরণে নিয়ম মানার প্রয়োজন
শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষায় সব বিষয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান মানবিক বিবেচনায় সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। ফলে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরাও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে সিজিয়ারা উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা বলা যায়। টেস্ট পরীক্ষায় সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল ৫৩ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা হয় ৮৩ জনের। ফলাফলে পাস করেছে ৪০ জন, যার মধ্যে একজন পেয়েছে এ প্লাস। পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এখানে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা অন্য কোনো অনৈতিক প্রভাব ছিল না। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের কোথায় ভুল হয়েছে? নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে হয়তো ফলাফল আরও ভালো হতে পারত।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা
ফল বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীর হাতে বইয়ের চেয়ে স্মার্টফোন বেশি সময় থাকে। পাবজি, ফ্রি ফায়ার, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে তারা দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে।
অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অভিভাবকের কথা শুনছে না, শিক্ষকের কথাও গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তির সংকট তৈরি হতে পারে।
তাই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ নয়, বরং প্রযুক্তির সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পড়াশোনা, সৃজনশীলতা ও জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করতে হবে।
শিক্ষককে শাসনের সুযোগ দিতে হবে
একসময় শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীদের শাসন ও নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর ভূমিকা ছিল। বর্তমানে কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুলের জন্য শাসন করতে গেলে অনেক সময় অভিভাবক বা স্থানীয় লোকজনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন। কখনো পরিস্থিতি মামলা পর্যন্ত গড়ায়।
ফলে অনেক শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের শাসন করতে ভয় পান। বিশেষ করে এনটিআরসির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক স্থানীয় না হওয়ায় তারা স্থানীয় পরিবেশ ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে আরও সতর্ক থাকেন।
অবশ্যই শাসনের নামে কোনো ধরনের নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভুল সংশোধন, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ শেখানোর জন্য শিক্ষকের নৈতিক কর্তৃত্ব থাকা জরুরি। শাসন ও নির্যাতনের মধ্যে পার্থক্য বুঝে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বারবার কারিকুলাম পরিবর্তনের প্রভাব
শিক্ষাব্যবস্থায় বারবার কারিকুলাম ও পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যেমন মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়েছে, তেমনি অনেক শিক্ষকও যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির অভাবে কাঙ্ক্ষিতভাবে মানিয়ে নিতে পারেননি।
এর পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের দুর্বলতাও রয়েছে। দক্ষ, পরিশ্রমী ও যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। তাই শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন নয়, এর বাস্তবায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব—সবকিছুর ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
অভিভাবকদের দায়িত্বও কম নয়
একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না বা দিচ্ছেন না।
অভিভাবক সমাবেশে অনেক সময় উপস্থিতি থাকে খুবই কম। এমনকি ফোন করেও অনেক অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থী পড়ার টেবিলে নেই।
একটি অভিভাবক সমাবেশের অভিজ্ঞতা আরও হতাশাজনক। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ৮৫ জন অভিভাবককে এক সপ্তাহ ধরে আমন্ত্রণ জানানোর পর উপস্থিত হয়েছিলেন মাত্র সাতজন। এই চিত্রই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—শুধু বিদ্যালয় নয়, পরিবারকেও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর এই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করার প্রধান কারিগর শিক্ষক। অথচ একজন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এনটিআরসি শিক্ষক মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেও মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন—বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভাবনার।
অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আর্থিক সংকটে ভুগছে। ফলে শিক্ষকরা যথাযথ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একজন শিক্ষক যখন নিজের সংসার চালানো নিয়েই দুশ্চিন্তায় থাকেন, তখন তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত মনোযোগ ও সৃজনশীলতা প্রত্যাশা করাও কঠিন।
শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। যথাযথ বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষকদের একটি অংশ কোচিংনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শ্রেণিকক্ষে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন—এটাই প্রত্যাশা।
তাহলে উত্তরণের পথ কী?
আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে—এটি সত্য। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতাও সত্য। তাই ফল বিপর্যয়ের দায় একে অন্যের ওপর চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও পরিচালনা কমিটি—সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষা বোর্ড ও সরকারকেও বাস্তবমুখী, স্থিতিশীল ও শিক্ষার্থী-শিক্ষকবান্ধব শিক্ষানীতি গ্রহণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনে রাখতে হবে—কাজ করা আর কাজ সঠিকভাবে করার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা শুধু কাজ করলেই হবে না; কাজটি কতটা সঠিকভাবে করছি, তারও মূল্যায়ন করতে হবে।
এসএসসি-২০২৬-এর ফলাফল তাই শুধু হতাশ হওয়ার বিষয় নয়; এটি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই যদি ভুলগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং সম্মিলিতভাবে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে আগামী দিনের ফলাফল অবশ্যই ভালো হবে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই আজকের আত্মউপলব্ধিই হতে পারে আগামী দিনের সাফল্যের প্রথম ধাপ।
লেখক: সাবেক সভাপতি,সিজিয়ারা উচ্চ বিদ্যালয়,
নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা
সম্পাদনায়- এমএস ভূঁইয়া

প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্রের দায়িত্ব পেলেন

Logo

এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফল বিপর্যয়: আমাদের আত্মউপলব্ধির সময়-- শেখ শাহজাহান সাজু:

dailyneighbour.com
নিউজ লিংক কমেন্টে
Aug 12, 2026