ডিজিটাল যুগে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পরিধি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, অপতথ্য মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
আজ রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘রাজনীতি, ক্ষমতা ও আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, আগে তথ্যের একমুখী প্রবাহ থাকলেও এখন ডিজিটাল মাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ অনেক বেড়েছে। এ বাস্তবতায় সাংবাদিকদের সত্য উদ্ঘাটন ও বস্তুনিষ্ঠতার দায়িত্ব আরও বেড়েছে।তিনি বলেন, সাংবাদিকতার জন্য সত্য উদ্ঘাটন এবং বস্তুনিষ্ঠতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জনকল্যাণও একটি বড় বিষয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করলে বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তথ্য উপস্থাপনের উদ্দেশ্য যদি কেবল লক্ষ্য অর্জন হয়, তাহলে সত্য ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনার একটি নির্ধারিত বয়ান থাকে। কিন্তু সেই বয়ানগুলো কে নির্মাণ করছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। সত্য উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়াটি যদি সার্বজনীন না হয়, তবে ইতিহাসের বিতর্কগুলো অনিষ্পন্নই থেকে যাবে।রাষ্ট্র নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে মন্তব্য করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, শাসক ভালো হোন বা খারাপ, তাঁর হাতে রাষ্ট্র ও শাসনের দণ্ড চলে আসে। তিনি যদি লক্ষ্যহীন হন কিংবা কেবল ক্ষমতা ভোগের প্রবৃত্তিতে মত্ত থাকেন, তবে রাষ্ট্র একটি নিপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হয়। ইতিহাসে এমন অনেক জনপ্রিয় শাসককে আমরা দেখেছি যারা ক্ষমতায় যাওয়ার সময় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেলেও সঠিক লক্ষ্য ও জনসেবার অভাবে অল্প সময়েই অতলে হারিয়ে গেছেন।
সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের কাজ নয়; এটি জনস্বার্থ রক্ষার একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। তিনি বলেন, তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা’র আড়ালে বিদ্যমান জনস্বার্থবিরোধী ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখা হয়। তাই তরুণদের ‘লিপ্ততার সাংবাদিকতা’ বা মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়াকু সাংবাদিকতায় যুক্ত হতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো সরকার কি এমন কারিকুলাম অনুমোদন করবে, যা তাদের নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়? করবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম মূলত রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেণির হস্তক্ষেপমুক্ত জ্ঞানচর্চার লড়াই।সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতার ধারণার সমালোচনা করে নূরুল কবীর বলেন, একটি সমাজে যখন অন্যায়, বৈষম্য এবং জনস্বার্থবিরোধী আইন জারি থাকে, তখন সাংবাদিকতা নিরপেক্ষ হতে পারে না। তথাকথিত নিরপেক্ষতার অর্থ হলো আসলে প্রতিবাদ না করে বিদ্যমান অন্যায় ব্যবস্থাকেই চলতে দেওয়া।
তিনি বলেন, তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে নাগরিকের মধ্যে সচেতন মতামত তৈরি হয় এবং প্রয়োজনে শোষিত মানুষের পক্ষেও সাংবাদিককে অবস্থান নিতে হয়।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথে বিদ্যমান আইনকে অন্তরায় উল্লেখ করে নূরুল কবীর বলেন, ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে দুবার স্বাধীন হওয়ার পরও আমরা এখনো সেই ঔপনিবেশিক আইন মাথায় নিয়ে সাংবাদিকতা করছি। এখনো প্রকাশনার লাইসেন্স নিতে গিয়ে সরকারকে মুচলেকা দিতে হয় যে তাদের বিরুদ্ধে কিছু লেখা হবে না—এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। এ সময় তিনি এসব ‘কালো আইন’ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাংবাদিকরা দেশ ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। নিষ্ঠা, সততা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।